আল মাহমুদের কবিতায় শক্ত ও প্রতিবাদী উচ্চারণ

শনিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

আল মাহমুদের কবিতায় শক্ত ও প্রতিবাদী উচ্চারণ

 

ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!/শুয়োরমুখো ট্রাক আসবে/দুয়োর বেঁধে রাখ।/কেন বাঁধবো দোর জানালা/তুলবো কেন খিল?/আসাদ গেছে মিছিল নিয়ে/ফিরবে সে মিছিল।/ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!/ট্রাকের মুখে আগুন দিতে/মতিয়ুরকে ডাক।/কোথায় পাবো মতিয়ুরকে/ঘুমিয়ে আছেসে!/তোরাই তবে সোনামানিক/আগুন জ্বেলে দে।’-(ঊনসত্তরের ছড়া-১,আল মাহমুদ)- কী প্রতিবাদী কবিতা! এরকম ছড়া-কবিতা অনেক লিখেছেন কবি আল মাহমুদ। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রাম ও নানারকম বৈষম্য নিয়ে কলম ধরেছেন তিনি।
একুশ নিয়ে জনপ্রিয় ও প্রতিবাদী আর একটি কবিতা একুশের কবিতা’। কী শক্ত  উচ্চারণ ফেব্রুয়ারি একুশ তারিখ/দুপুর বেলার অক্ত/বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?/বরকতের রক্ত। হাজার যুগের সূর্যতাপে/ জ্বলবে এমন লাল যে,/সেই লোহিতেই লাল হয়েছে/কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে!/প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে/ছড়াও ফুলের বন্যা/বিষাদ গীতি গাইছে পথে/তিতুমীরের কন্যা।/চিনতে না কি সোনার ছেলে/ক্ষুদিরামকে চিনতে?/রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে/মুক্ত বাতাস কিনতে?/পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়/ঝাঁপ দিল যে অগ্নি,/ফেব্রুয়ারির শোকের বসন/পরলো তারই ভগ্নী।/প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী/আমায় নেবে সঙ্গে,/বাংলা আমার বচন, আমি/জন্মেছি এই বঙ্গে।’
নারীর মতামত দেওয়ার ক্ষমতা নেই বললেই চলে। বিয়ের সময়েও চাপিয়ে দেওয়া বা শিখিয়ে দেওয়া কথাই বলতে হয়। নারী প্রেমিকা; নারী শক্তির উৎস। নারীর অসহায়ত্ম নিয়ে কবি আল মাহমুদ লিখলেন  দীর্ঘ পাতাগুলো না না করে কাঁপছে। বৈঠকখানা থেকে আব্বা/একবার আমাকে দেখে নিয়ে মুখ নিচু করে পড়তে থাকবেন,/ফাবি আইয়ে আলা ই-রাব্বিকুমা তুকাজ্বিবান…’- (প্রত্যাবর্তনের লজ্জা: সোনালি কাবিন)। ‘প্রতীকী’ হিসাবে বিভিন্ন উপদানে অনেক কবিতায় বুনন দিয়েছেন। শৈল্পিকবুননে কবিতার শৈলীকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ‘চাকমা মেয়ে রাকমা/ফুল গোঁজে না কেশে/কাপ্তাইয়ের ঝিলের জলে/জুম গিয়েছে ভেসে/জুম গিয়েছে ঘুম গিয়েছে/ডুবলো হাঁড়িকুড়ি,/পাহাড় ডোবে পাথর ডোবে/ওঠে না ভ‚রিভ‚রি…।’- কয়েকটি লাইনে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সর্বনাশের কাহিনির বর্ণনা! আরও কিছু উদাহরণ-



আমাদের ওয়েবে প্রতি শনিবার সাহিত্য পাতায় গল্প, কবিতা প্রবন্ধ প্রকাশ করা হয় । আপনিও লেখা পাঠাতে পারেন। মনোনীত হলে প্রকাশ করা হবে ।  পাঠানোর ঠিকানাঃ  editor@thesaturdaynews.com 


(১) ‘তোমাকে ডেকেছি বলে আমি/নড়ে ওঠে জগত জঙ্গম/…জীবন কি ডানারই আওয়াজ/কিংবা কোন উড়ন্ত শকুন?/আজ একটু ঠাঁই দাও মেঘে/সাঁকো বাঁধো শূন্যের ওপর/বুকে টানো মাংসের আবেগে/যেন নিজ সন্তানের জ্বর।/আর নয় প্রেম,দাও দয়া/…আমি ঠিক চিনি বা না চিনি/তারই প্রতি অজস্র সালাম।’-(ডাক, আল মাহমুদ)
(২) ‘নোলক আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে/হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।/নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমার কাছে?-/হাত দিওনা আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে।/…সবুজ চুলে ফুল পিন্দেছি নোলক পরি নাতো!/ ফুলের গন্ধ চাও যদি নাও, হাত পাতো হাত পাতো/ বলে পাহাড় দেখায় তাহার আহার ভরা বুক/ হাজার হরিণ পাতার ফাঁকে বাঁকিয়ে রাখে মুখ।/এলিয়ে খোঁপা রাত্রি এলেন, ফের বাড়ালাম পা/আমার মায়ের গয়না ছাড়া ঘরকে যাবো না।’-(নোলক)
ভাষা আন্দোলনে কবি-সাহিত্যিকদের ভূমিকা অনেক। কবি আল মাহমুদও ব্যতিক্রম নন। তিনি মুক্তিযুদ্ধেও ঝাপিয়ে পড়েছেন। কবিতা ও ছড়ায় শত্রæদের প্রতি শক্ত শক্ত উচ্চারণ করেছেন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে‘প্রতীকী’ শব্দ-অলংকার ব্যবহার করেছেন। ভাষা আন্দোলন থেকে ঊনসত্তরের গণঅভ্যত্থান; বৈষম্য থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম- সর্বত্র আল মাহমুদের পদচারণা রয়েছে। কবির জীবনের শেষের দিকের বিতর্কিত অংশ এড়িয়ে গেলে এমন শক্ত উচ্চারণের কবিতা অনেক পাওয়া যাবে।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা/ ফেব্রুয়ারি   ১৩২০২১

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১:১৮ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com