আত্নহনন

শনিবার, ১৬ জুলাই ২০১৬

আত্নহনন

আত্নহনন
বিতান সিকদার

 


 

Litearture 01নিমের দাঁতনটা দাঁতে চেপে বটুক সকাল সকালই গামছা পরে আত্মহত্যা করতে বেরিয়ে পড়ল। গন্তব্য ফটিকদের পুকুর। পুকুর তো নয়, দিঘি বলাই ভালো। বটুক ওখানেই ডুবে মরবে!

না, মরার যে খুব একটা জুতসই কারণ আছে, তা নয়। তবে বেঁচে থাকারও যে খুব একটা দরকার আছে- তাও নয়। অনেক তো হলো, এবার বোধহয় গেলেই হয়!

কী কী হলো?

কেন? ছোট্ট বটু নয় নয় করে সাতাশ পেরিয়ে দামড়া বটুক হয়ে গেল। ইস্কুল ফাইনাল একেবারে উতরে গেলেও, উচ্চ মাধ্যমিক একবার হেসেখেলে ব্যাক পাওয়া গেল। বটুকের যখন কুড়ি বছর বয়স, তখন বক্কেশ্বর থেকে ফেরার পথে গাড়ির ধাক্কায় বাপ-মা চলে যাওয়ার পর তাদের মুখে আগুন দেওয়া গেল। সাইকেল সারানোর দোকান খুলে সেই রোজগার থেকে জুয়াড়ি বাপের দেনা শোধ করা গেল। ব্যবসা বড় করে দু-পয়সার মুখ দেখা গেল।

আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার, বছর দুই আগে হত্তুকিকে বিয়ে করা গেল। বামুন পুকুরের মেয়ে। গোছান গেরস্ত। হত্তুকির বাপ সনাতন সমাদ্দার বলেছিলেন, ‘ওর একটা ভালো নাম আছে- নীলিমা।’ তা বটুক অবিশ্যি ওই সব লালিমা-নীলিমায় না গিয়ে আড়ালে ‘হুতু’ বলে ডাকত। আলগা চুলকানি! অমন ডাকাডাকি অবিশ্যি বিয়ের পর মাসকয়েক থাকে। তারপর শালা কোত্থেকে কে যেন ধুনো জ্বেলে দেয়। এমনই এক মিষ্টি রোদ্দুর ভেজা সকালে বটুক দাওয়ার খুঁটিটা জড়িয়ে ধরে হয়তো আদুরে গলায় ডাকল, ‘শুনছো!’ রান্নাঘরের ভেতর থেকে আওয়াজ এলো, ‘এখন শুনলে ভাত নামাবে কে? তোমার বাবা?’

তা বাক্যে অমন একটু-আধটু বিষ সবারই থাকে। ও নিয়ে বটুকের ভাবনা নেই। অমন গোলপানা মুখ, ঢল ঢল চোখ, টিয়াপাখির মতো ঠোঁট, ফর্সা রং, গলার কাছে আঁচিল- তারপর অমন- থাক সে কথা, বটুক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে আর নিচে নামার দরকার নেই।

পুকুরপাড়। বটুক এলাকাটা একবার জরিপ করে নিয়ে ভাবে, পাড় ধরে চক্কর মেরে ওই রেললাইনের ধারে যে ঘাটটা আছে, ওখান দিয়ে নামা ভালো। ওপাড়টা নিরিবিলি। এদিকটা একেবারে রাস্তার ধারে। লোকজন হাঁটাহাঁটি করছে। এই তো ভ্যানে করে মেয়েরা বিদ্যাসুন্দরী ইস্কুলের দিকে গেল। মেয়েদের মধ্যে আবার তাঁতিপাড়ার নেত্যকালি ছিল। হাত নেড়ে বলল, ‘বটুকদাদা বটুকদাদা!’

নেত্য ছয় ক্লাসে পড়ে। সেই যবে সাপে কাটা নেত্যকে বটুক কোলে নিয়ে তিন মাইল দৌড়ে সদর হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিল, তবে থেকে নেত্য বটুকের ভারি ন্যাওটা! তা শুধু নেত্য কেন, নেত্যর বাপ-মা সবাই। এই তো সেদিনও রাধাবাজারের হাটে কুমুদিনী মাসির সঙ্গে দেখা। মাসি বেছে বেছে পটোল তুলছিল। বটুককে দেখেই, ‘আজ তুই না থাকলে আমার নেত্যটা…’ বলেই শাড়ির আঁচল চোখ মুছে, ‘আড়াইশো  শিম দিয়ো।’

অতএব এদিকটা দিয়ে জলে লাফ মেরে খুব একটা সুবিধে করা যাবে না। ডুবছে ঠাহর করলে রাস্তার যে কেউ লাফ মেরে নড়া ধরে তুলে নিয়ে আসবে। ওপাড়টাই ভালো!

অবিশ্যি এমন সকাল সকাল জলে ডোবার ধান্দা করলে লোক জানাজানির একটা সম্ভাবনা তো থাকেই। তবে বটুকের নিজের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। এক সাঁতারে গঙ্গা পার হওয়া ছেলে সে। টলটলে জল তাকে চিরকালই টেনে এসেছে। সেই যেবা রাসের ভাসানের সময় যখন আকণ্ঠ গিলে কলুপাড়ার মোদো রাসু শ্মশানকালীর সঙ্গে নিজেও গঙ্গায় লাফ দিল- ‘জয় তারা’- তখন বটুকই তো গেঁড়েব্যাটাকে জল থেকে তুলে এনেছিল। তারপর পোসেনজিতের মতো কেলিয়ে রাসুর নেশা নামিয়েছিল। ওর বউ এখনো দেখা হলে বলে, ‘বটুকদা, কী বলে যে তোমায়…’

তা যাক সেসব কথা। মোদ্দা ব্যাপার হচ্ছে জল নিয়ে বটুকের সঙ্গে সাক্ষাৎ জল- ও পেঁয়াজি করতে আসবে না। বটুক ছক কষেই রেখেছে। সড়াক করে ডুবসাঁতার দিয়ে দিঘির মাঝামাঝি চলে যাবে। ব্যস, এরপর যতক্ষণ না মরছে, কিছুতেই ওপরে উঠবে না।

অবিশ্যি মরার জন্য আরো উপায় ছিল, তবে বটুকের সেসব পছন্দ নয়। বিশেষত মরাটা যখন শখের, তখন ভালোভাবেই মরা ভালো! গলায় দড়ি বটুকের পছন্দ নয়। মাফলার জড়ালেই দম বন্ধ হয়ে আসে, তায় দড়ি ধরে টান- রাম রাম! গায়ে আগুন তো নৈব নৈব চ! সেই গেলবারে কালীপুজোর সময় বাগচিদের মাঠে অন্তা চরকি ছাড়ল। সেই চরকি কে জানে কোন মন্ত্রবলে ছুঁচোবাজি হয়ে ফস করে বটুকের লুঙ্গির তলায় ঢুকে- ওহ্, সে কী বিকট অনুভূতি রে বাবা! অণ্ডকোষে ফোসকা পড়ে একেবারে যা তা অবস্থা!

এরপর আছে রেললাইনে গলা দেওয়া। তবে আজ রোববার, মেন লাইনে গাড়ি কম। তার ওপর অমন দানোর মতো একটা জিনিস এলাকা কাঁপিয়ে এগিয়ে আসছে। শেষটায় ড্রাইভার বুঝতে পেরে যদি ব্রেক-ঝেক কষে মাল থামিয়ে দেয়- একেবারে গণধোলাই!

বাকি থাকে বিষ খাওয়া। বটুক ভেবে দেখেছে, ওটাও ডাইসি কেস। শালা খেলেই যে মরবে, গ্যারান্টি নেই। পাম্প-ঝাম্প করে নাকি পেট থেকে মাল বের করে দেয়। তেমনতর হলে লজ্জার একশেষ! এলাকায় ঢিঢি পড়ে যাবে।

এপাড়টা বেশ। ভাঙাচোরা ঘাটে বটুক গুছিয়ে উবু হয়ে বসে। বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। ফাগুন মাসের সকাল বলে কথা। বটুক অবিশ্যি সারা গায়ে আচ্ছাসে তেল মেখে এসেছে। মরার আগে আবার ঠান্ডা লেগে বিপত্তি না বাধে। অমন নাক টানতে টানতে মরা যায় না… নেহাতই ব্যাপারটা যখন শখের…

গামছার গিঁট আলগা করে বটুক এক বান্ডিল লালসুতোর বিড়ি আর দেশলাই বার করল। গুছিয়ে বিড়ি খেতে হবে- কে জানে বাপু, ওপরে যদি আবার পাওয়া না যায়!

দুটো টান দিয়েছে কি দেয়নি, অমনি পেছন থেকে, ‘কে ও? ঘাটে কে রে?’

বটুক ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বেনেপুকুরের ধীরেন খুড়ো। মোলো যা- আর আসবার সময় পেল না। মরতে এখনই উদয় হতে হলো? বুড়োর নব্বইয়ের কাছে বয়স। সারা দিন এপাড়া-ওপাড়া টইটই করছে। চোখেও তো ভালো দেখে না। এমন আদাড়বাদাড়ে সেঁধোল কেমন করে?

– তুই কে বাপ?

– ‘বটুক। তুমি এখানে কী করছ?’ বটুক খেঁকিয়ে ওঠে।

– বটুক? ঢ্যামনা বটুক?

কথাটা শুনে বটুক চোখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে বুড়োর দিকে চেয়ে রইল। তারপর আশপাশে একবার চোখ বুলিয়ে আস্তে করে বলল, ‘হ্যাঁ।’

– ‘অ, তাই বল। তা বসি একটু তোর পাশে,’ বুড়ো সাবধানে ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে বটুকের পাশে।

– কেন? আমার পাশে বসে কী করবে?

– ‘নাহ, করার কিছুই নেই। একটু কথা কই,’ বুড়ো বসে বলে, ‘তা তুই সক্কাল সক্কাল এখানে যে বড়?’

– মরতে এসেছি।

–  তা ভালো! আমার তো আর আসে না, তোরাই যারা যারা পারিস চলে যা।

–  তা তুমি এখানে কী করছ? চোখেও তো দ্যাখো না-  ছাতার মাথা কোথাও পড়ে থাকলে দেখবে কে?

–  না, না, দেখবে আবার কে? এতকাল ধরে ছেলেরা দেখে এলো- এখনো  দেখবে? ওকথা মুখে আনাও পাপ। তা যাকগে আমার কথা। বলছিলাম কি ছান করবি তো?

–  তুমি তোমার কাজে যাও তো।

–  বলে দ্যাকো! এক আমি, তায় আমার আবার কাজ। দে, একটা বিড়ি দে দেখি, ধীরেন হাত পাতে।

বটুক অনিচ্ছা সত্ত্বেও নমো নমো করে একটা বিড়ি এগিয়ে দেয়। মেলা জ্বালা! যদিও এক বান্ডিল আছে, তবু অমন দুমদাম বিলোলে চলবে কেন? বটুক অনেক ভেবেচিন্তে বড় বান্ডিল কিনেছে, সঙ্গে গোটা দেশলাই। মরার পরক্ষণ থেকে মরে থিতু হওয়া পর্যন্ত কতটা সময় বা কেমনতর রাস্তা-  কিছুই জানা নেই। বিড়ি-দেশলাই থাকা ভালো।

– তা হ্যাঁরে ঢ্যামনা, ন’টা তো বেজে গেছে সেই কখন। আজ দোকান খুলবি না?

–  ‘গেলে তুমি?’ বটুক এবার চেঁচিয়ে ওঠে।

–  দ্যাকো কাণ্ড! রাগ করলি নাকি বাপ? বালাই ষাট! আমি তো ভালোবেসে তোকে ঢ্যামনা বলে ডাকি। ঢ্যামনা মানে ভালোমানুষ রে।

–  থাক! এখন বিড়ি খেয়ে দয়া করে বিদেয় হও।

–  ও কী কথা! বিদেয় হব কোন চুলোয়? তার চেয়ে আমি বরং এখানে বসে তোর চটিজোড়া পাহারা দিই। তুই ছান-টান সেরে নে। তারপর একসাথে চলা যাবেখন। পারলে গামছাটাও রেখে যা। উদোম হয়ে পুকুরে ছান-  ওহ্, সে ভারী মজা।

–  আহ্, তুমি থামো তো দেখি। উদোম হয়ে নামতে বটুকের বয়েই গেছে। গামছার গিঁটে বিড়ি-দেশলাই বেঁধে নিতে হবে না? চিন্তা একটাই, শালা জলে ভিজে বিড়িগুলো ফের জ্বলবে তো? অবিশ্যি মরার পর যদি বটুক ফের জেগে ওঠে বিড়ি ধরাতে পারে, তবে ভেজা দেশলাইও বা জ্বলবে না কেন? ঠিক কথা, এ হাতছাড়া করা যাবে না। খুড়োটা পাগলাটে মেরে গেছে। বয়স বেশি বেড়ে গেলে এই-ই হয়। গলাটা একটু খাঁকরে বটুক বলল, ‘তোমায় কে বলল চান করতে নামব? বললাম না তখন মরতে এসেছি? এখানে ডুবে মরব।’

–  হ্যাঁ, তা তো বললি। তুই বললি-  আমিও শুনলাম। ভেবেছিলাম রসিকতা করছিস।

–  না, রসিকতা নয়।

–  আহা কতদিন যে মরণ দেখি না। তা তুই মর, আমি দু’চোখ ভরে দেখি। তারপর নিজের মনেই বিড়বিড় করে বুড়ো, ‘তাই বা কী করে। শালা চোখেও তো ঠিকমতো…’ পরক্ষণেই ফের বটুকের দিকে ফিরে, ‘তা সে যাই হোক। তুই মর বাবা মর… নিশ্চিন্তে মর দেখি।’

–  আমি মরব আর তুমি দেখবে? আমায় বাঁচাবে না?

–  রাম রাম! ও কেউ করে? সেই যেবার সান্নিপাতিক হলো, তুই বগলদাবা করে ভবেন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলি। ওহ্-  সে সারা রাত ধরে ওষুধ গিলিয়ে সেবা করে তবে আবার ফিরিয়ে আনলি। আছোলা দিয়েছিলি বাপ! তখন বুঝিনি। সেই যে ফিরে এলাম-  চারটে বচ্ছর গড়িয়ে গেল-  আর যাওয়ার নাম করি না গো।

–  যাবে কেন? দিব্যি তো আছ।

–  তা থাকলেই বা। তাই বলে যাব না? রয়েই যাব?

–  আহা তা যাবে না কেন? যাবে তো সবাই। কিন্তু একটা কারণ থাকবে তো? অমন ফস করে যাওয়া যায় নাকি?

–  বুড়ো মানুষের আবার কারণের অভাব? এই তো, কাল রাত থেকে বুকের বাঁ-দিকটা চিন চিন করছে। এর ধাক্কাতেই তো যেতে পারি। তার ওপর হাঁপানি জাপানি নাকানি চোবানি-  কত কিছু। থেকে থেকে মাথা ঘুরে পড়ে যাই। সেদিন পঞ্চা বলল আমি নাকি খাটেই হেগেমুতে একসা করেছি। তবে? ওরে আমার কি যাওয়ার কারণের অভাব?

–  অ!

–  তা আমার কথা ছাড়ান দে। তোর কথা বল। দিব্যি তো সংসার করছিলি। আবার যাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগলি যে বড়?

ফুরফুরে হাওয়ায় বসে বটুক ভাবে, তা বটে-  এক্কেবারে চলে যাওয়ার মতো কারণ ঘটেনি বটে, তবে জীবনটা বড় পানসে ঠেকছে। থেকেও যে সে বিশেষ কিছু করে উঠতে পারবে না, তা বটুক বেশ বুঝে গেছে। সবই কেমন যেন নিয়মমাফিক ঘটছে। শালা কোনো ওঠাপড়া নেই। সেই এক সকালে ওঠো, বাজার করো, চান করো, দোকান খোলো, সারা দিন ব্যবসা করো, সন্ধেবেলা পরানটা ছুক ছুক করলে দু’পাত্তর গেলো, বাড়ি ফিরে হত্তুকির সঙ্গে একটু খুনসুটি করো, তার মেজাজ ভালো না থাকলে দু’চারটে চোখাচোখা বিশেষণ শোনো, রাতে গান্ডেপিন্ডে গেলো, চোখ বোজো। ব্যস, ফের সকাল চলে এলো। এই একই কেত্তন চলেই চলেছে। ধুর ধুর!

হত্তুকিটাও যেন কেমন! বর শান্তিতে আত্মহত্যা করতে পারবে, এমন দু-একটা কাজও কী করতে নেই রে ভালোমানুষের মেয়ে? কই দিগম্বরের বউ তো অমন নয়। এটা চাই ওটা চাই করে-  তারপর এর ওর সাথে ফষ্টিনষ্টি করে দিগম্বরকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষমেশ গলায় দড়ি দেওয়াল তো! তারপর হচ্ছে গিয়ে চাষিপাড়ার হারাধনের বউ-  সেই প্রোমোটার মদনের সঙ্গে ভেগে গিয়ে পোয়াতি হয়ে ফিরে এলো। হারাধন দা দিয়ে কোপাতে গেছিল। আহা, শুনেও শান্তি! জীবনে কেমন সুন্দর একটা ওঠাপড়া আছে।

আর বটুক? নাহ, এভাবে বাঁচার কোনো মানে নেই।

অবিশ্যি বটুক চাইলে অমন দু-একটা সন্দেহ জুটতেই পারে। এই যে কাগজ দেয় মৃত্যুঞ্জয়-  হুঁ হুঁ, বটুক কি কিছু বোঝে না নাকি? অমন না চাইতেও রোজ বাড়িতে এসে ‘বটুকদাদা বটুকদাদা’ করে বিক্রি না হওয়া কাগজ বিনি পয়সায় ধরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, সে কি এমনি এমনি? তারপর যাওয়ার সময় অমন অহেতুক ‘ক্রিং ক্রিং’ করে বেল বাজানোরই বা মানেটা কী? তা আসুক। বটুকের সেসবে আপত্তি নেই। জ্বালা হয়েছে এই এক হত্তুকি। এই যে ছোকরা রোজ এসে কাগজ পড়িয়ে যায়, তা তার সামনে কি একবারও বেরোতে নেই? এক-দুদিন তো একটু চা নিয়েও সাধাসাধি করতে হয়। তা না, নবাবের বেটি ভেতরে হেঁসেল সামলাচ্ছে। শালা বউটা মহা খচ্চর।

ফলে সন্দেহটা পাকব পাকব করেও পেকে উঠছে না। বটুক ভেবেছিল, দুটো দিন যাক। আপসে একটা গল্প তৈরি হবে। সে গুড়েবালি! সেদিন দোকানের মেকানিক সুবল চারু ভচ্চাযের সাইকেলে হাওয়া দিতে দিতে বলল, ‘ওহ্, এই হচ্ছে বৌদি! হাটে মৃত্যুঞ্জয়কে ধরেছিল, ‘তোমায় ভাই টাকা নিতে হবে… না না, অমন রোজ রোজ বিনি পয়সায় কাগজ নিতে পারব না। আমার বর কাগজ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে ভালোবাসে, আর তুমি কাগজ বিক্রি করো… আমার বর পয়সা দিয়েই পড়বে! ওহ মৃত্যুঞ্জয় একেবারে শুকিয়ে আমসি… কড়কড়ে নোটগুলো গুনে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল।’

বটুক ক্যাশ কাউন্টারে বসে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে সুবলের বক্তব্য শুনছিল। সুবল দেখে বলল, ‘কী হলো? মুখখানা অমন করে রেখেছ কেন?’

–  ‘ঠিক করে পাম দে দিকি!‘ বটুক খেঁকিয়ে উঠেছিল।

বিড়িটা পুকুরের জলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বটুক আবার ভাবতে বসল, সবাই মিলে এলাকা পানসে করে ছেড়ে দিল। এই যে সুবল-  চার বছর ধরে বটুকের দোকানে সাইকেল মেরামতি করে। শালা ষুধিষ্ঠিরের বাচ্চা! ওরে নিজে দোকান খুলিস, ব্যবসা সামলাস, উদয়াস্ত খাটিস-  তা ক্যাশবাক্স থেকে কি কখনো একটু-আধটু টাকা-পয়সা সরাতে নেই রে? আদ্দেক সময় তো বটুক দোকানেই থাকে না। ফিরে এসে দেখে যে কে সেই-  পাই পয়সা গোনা। সুবল স্ক্রু টাইট দিচ্ছে। কই টাকা-পয়সা মেরে দিয়ে ফেরার হয়ে যাবি বা নিজের দোকান বলে কোনো ধুরন্ধর কাউকে বেঁচে দিবি, সেই নিয়ে বটুক অথৈ জলে পড়বে, কোর্ট-কাছারি হবে, মামলা-মোকদ্দমা… শেষমেশ রাস্তায় নামবে বটুক-  নাহ্ অত সুখ বটুকের কপালে নেই। শালা উল্টে বউদির কেত্তন গাইছে। মুখে আগুন!

না না, অনেক হয়ে গেছে। অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকিয়ে যায়। এখন শালা এই দিঘি শুকিয়ে যাওয়ার আগে এর ভেতরে গিয়ে পড়তে হয়।

–  বললি না বাপ? মরতে এলি কেন?

–  সুখের চোটে!

–  তা ভালো। সব সময় অমন কষ্টেই মরতে হবে-  না, এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি।

–  তুমি কি আরেকটা বিড়ি খাবে?

–  কেন বল তো? মানে দিলে খাব, কিন্তু হঠাৎ জানতে চাইলি যে বড়? আরেকটা বিড়ি কি খাওয়া উচিত?

বটুক ঝাঁঝিয়ে উঠল, ‘না, এবার দয়া করে এসো। তুমি তো মাইরি আচ্ছা খুড়ো! সেই কখন থেকে বলছি যাও যাও, তা ওঠার নামই করো না। বলি গিয়ে লোকজনকে খবরটা দেবে তো-  বটুক ডুবে মরেছে, লাশ তুলতে হবে!

–  না না, তা তো বটেই। তবে তাই যাই। মানে চলেই যেতাম। তা তুই আবার ফস করে বিড়ি নিয়ে সাধাসাধি করলি কি না। তা দে, বলছিস যখন, আরেকটা দে। টেনেই যাই।

বটুক অগত্যা আবারও একটা বিড়ি বার করল।

ধীরেন আয়েশ করে বিড়িটা ধরাতে যাবে, দূর থেকে খোলা গলায় আওয়াজ এলো, ‘ঘাটে কোন ঘাটের মড়া রে?’ কাত্যায়নী-  ফটিকের মেজো পিসি। দূরে বারান্দা থেকে ঠিক দেখেছে। অগত্যা বটুককে চেঁচিয়ে জবাব দিতে হলো, ‘আমি বটুক পিসিমা।’

–  বটুক? কোন বটুক? ও –  আমাদের চণ্ডীতলার বটুক? চান করতে এলি বুঝি?

–  না গো-  মরতে এসেছে। বলছে ডুবে মরবে…

–  ‘আহ, কী হচ্ছে কি খুড়ো,’ বটুক আলতো করে দাবড়ানি দেয়, ‘হ্যাঁ পিসিমা।’

–  তা কর। যাওয়ার আগে ডানদিকের কচুরিপানাগুলো একটু তুলে দিস তো বাপ।

–  ‘দেব পিসিমা,’ শালা শান্তিতে মরারও কি জো আছে? বটুক ধীরেনের দিকে ফিরে বলল, ‘তোমার জ্বালায় দেখছি মরাটাই না বেহাত হয়ে যায়। তুমি চেঁচিয়ে জানান দিতে গেলে, আমি মরতে এসেছি?’

–  অ, বলব না বলছিস?

–  না, আগে মরি।

–  ভুল করে বলে ফেলেছি। এ কোন দোকানের বিড়ি রে? শালা টানতে গেলে হাঁপ ধরে যাচ্ছে। অ বটুক, বলছিলাম কি, বুকের ব্যথাটা যে বাড়ল বাপ।

–  সে আবার কি! তা বুকে ব্যথা হচ্ছে তো বিড়ি খাচ্ছ কেন?

–  নাহ, পাক দিয়ে উঠছে বড়!

নাও- এবার বুড়োকে সামলাও। তার ওপর ডানদিকের কচুরিপানাও তুলতে হবে। হাজার ঝামেলার মধ্যেও বটুকের একটা সূক্ষ্ম আনন্দ হচ্ছিল। সেটা এই ভেবে যে, মরার আগেও কচুরিপানা তুলতে হচ্ছে-  মরার জন্য বোধহয় এই কারণই যথেষ্ট!

 

বটুক ঝপাস করে জলে লাফ মারল। ধীরেন একবার চমকে উঠে আবার সামলে নিয়ে বলল, ‘অ বটুক, বলি চললি নাকি?’ বটুক ততক্ষণে সাঁতরে ডানদিকটায় চলে এসেছে। কচুরিপানা ডাঁটিগুলো ধরে টান মারতে মারতে বলল, ‘না, চললাম আর কোথায়? শুনলে না কচুরিপানাগুলো তুলে দিতে বলল?’

–  তাই বল, আমি ভাবলাম বুঝি… তা ভালো কথা মনে পড়ে গেল। পঞ্চাননতলার সরস্বতী ঠাকুর এখনো বিসর্জন যায়নি, এই বলে রাখলাম। এ পুকুরেই ফেলে কিন্তু। তা তুই মরবি, তারপর ভাসান হবে তো এখানে? নাকি ঠাকুর আবার গঙ্গায় নিতে হবে?

–  কেন? এ পুকুরে ফেলবে কেন? কালুদের পুকুর কী হলো?

–  সে আমি কী জানি? নব বলছিল ফটিকদের পুকুরের কথা-  ফস করে মনে পড়ে গেল, তাই বললাম।

নাহ, ভগবানও আজ বাঁশ দেওয়ার মুডে আছে। সাতে নেই পাঁচে নেই-  নিজের মনে বেলাবেলি একটু মরব, তাতেও রাজ্যের ক্যাচাল-  ফটিকের আনন্দ মেশান বিরক্তিটা আস্তে আস্তে বাড়ছে। ফটিক অবিশ্যি এটাই চায়। বেঁচে থাকার মতো মরাটাও পানসে হবে, সে বড় যন্ত্রণার! চারপাশে সৎ আর ভালো মানুষের ঠেলা বড্ড চাপের। কী- না বউটা সতী, দোকানে কাজের ছেলেটা সৎ! ব্যবসা রম রম করে চলছে, অতএব পয়সার দুঃখুও এড়িয়ে গেল। শরীরে রোগভোগও বাসা বাঁধল না। এমন নির্ঝঞ্ঝাট জীবন নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে চলে যাওয়া ঢের ভালো। সেই যেতে গিয়ে সকাল থেকে কেত্তন। টিক টিক করে বুড়ো দেরি করিয়ে দিল। এখন কচুরিপানার চাপ। সেটা সামলাতে না সামলাতে বলছে ভাসান হবে কোথায়!

–  ও বটুক! মরলি নাকি?

–  ধুত্তোর!

–  যাক, আমি ভাবলাম গেলি বোধহয়!

–  কী হয়েছে?

–  না, ধুতিটা কেমন জানি পেসল পেসল লাগে। আমি কী করে ফেললাম?

–  এ্যাঁ, কী বিপদ? আরে পাশটাতে আমার চটিজোড়া যে। দেখো খুড়ো, আবার লেবড়ে-ঝেবড়ে একাকার করো না। মেলা জ্বালা!

–  পেটটাও কাল রাত থেকে কেমন কেমন যেন…

–  ‘তুমি মরতে সকালে বেরোতে গেলে কেন,’ বটুক তারস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে।

–  না না, করে ফেলব জানলে কি আর বেরোতাম? সকালে অবিশ্যি কুমোরপাড়ার পুটুও এক কথা বলল, ‘তুমি এ শরীর নিয়ে বেরিয়েছ কেন?’ বেরুবো না? না বেরুলে আর পাঁচটা লোকের সঙ্গে দেখা হয়? সারাক্ষণ ঘরে থাকতে…পুটু-  ওমা তুই পুটুকে চিনলি না? হারান পোদ্দারের মেয়ে। সেই যে বচ্ছর দুই আগে বে হলো। তা মেয়ে তো বেধবা হয়েছে। এখন আবার বাপের ভিটেতে এসে গেঁড়ে বসেছে। আরে পুটু রে …

–  ‘জানি জানি,’ বটুক বিড় বিড় করে।

… এ্যাদ্দিন পর আবার পুরোনো কাঁসন্দি… এতকিছু কি আজই জানার ছিল? বটুক চুপচাপ কোমর জলে দাঁড়িয়ে থাকে। পুটু..

বটুকের প্রথম প্রেম। সেই চার বছর আগে রাসমণির মাঠে ফুচকা খেতে খেতে বটুক যাকে প্রথম বলেছিল, ‘পুটু, তোমাকে আমার…’

–  ও বটুক, পেটটা বোধহয় সত্যিই…

বটুক দিঘির জলের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকিয়ে। ওহ্, সে কী চলাফেরা। পেছনে ছেলে-ছোকরাদের লাইন লেগে যেত। সে কী ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখা-  ওরে বাবা, সে কী চাহনি! পুটু বলেছিল, ‘আমায় বিয়ে করবে, তা খাওয়াবে কী?’

–  বাবা, বুকের ব্যথাটাও যে… ও বটুক!

তারপর সেই গোষ্টদের বাগান… রাত্তিরবেলা।

…পুটুর সে কী খিল খিল করে হাসি।

…বটুক বলদের মতো বোঝাতে গেছিল যে সে পুটুকে কতটা ভালোবাসে। পুটু হেসে বলেছিল ‘ধুর, তুমি পার না!’ ওহ্ কথাটা কাঁটার মতো বিঁধেছিল গো!

–  ওরে বাবা, ও বটুক… আমার ভেতরে কেমন যেন হচ্ছে রে…

সেই পুটু বেধবা হলো? এখানে এসে উঠল আবার?

… মানে আবারও আশপাশে ঘুরঘুর করবে?

মাঝদিঘিতে কী বেশ একটা ঘাই মারল।

–  ওরে বটকে রে… আমি গেছি!

চটক ভাঙে বটুকের। ‘কী, হলোটা কী? তুমি তো আচ্ছা জ্বালালে দেখ…’ ধীরেনের দিকে তাকিয়ে চুপ করে যায় বটুক। সব্বোনাশা বুড়ো তো! ঘাটে চিৎ হয়ে পড়ে আছে! ওমা, এ যেন গোঁ গোঁ করছে! বটুক হ্যাঁচোড়-প্যাঁচোড় করে এগিয়ে আসে, ‘ও খুড়ো, কী হলো গো?’

– বুকটা… নিশ্বাস নিতে … অফ!

বটুক তড়িঘড়ি জল থেকে উঠে আসে। এ কি অবস্থা! বুড়োর চোখমুখ উল্টে এ কি কাণ্ড, ‘ও খুড়ো, ও খুড়ো! আরে হচ্ছেটা কী? অমন করছ কেন?’

–  ‘আমি আর নেই রে,’ কোনো রকমে জবাব দেয় বুড়ো। হাত দিয়ে বুকের কাছটা ডলতে থাকে।

সব্বোনাশ! ‘ভেবো না, ভেবো না’ বলতে বলতে বটুক চকিতে ধীরেনকে কাঁধে পাশবালিশের মতো তুলে ফেলে। দূরে ফটিকদের বাড়ির বারান্দা থেকে আওয়াজ আসে, ‘ও বটুক, ও কাকে কোলে নিচ্ছিস রে? কচুরিপানাগুলো…’

–  ‘বিকেলে করে দেব পিসিমা,’ ধীরেনকে বইতে বইতে বটুক পুকুরপাড় ধরে হন হন করে রাস্তার দিকে হাঁটতে থাকে। মরবে? অত সোজা? চেঁচায় সে, ‘ধীরেন খুড়ো ফিট হয়ে গেছে গো! ওই রতন-  রতনাআআআ!’

রতন ভ্যানওয়ালা ইস্কুল মাঠে ইট ফেলে ফাঁকা গাড়ি নিয়ে স্টেশনের দিকে যাচ্ছিল। আওয়াজ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়, ভ্যান আস্তে করে, ‘এ কি গো? কী হলো?’

–  পুটু বেধবা হয়েছে!

–  এ্যাঁ?

–  ‘না না, বলছি ধীরেন খুড়ো ফিট গেছে রে,’ বটুক দৌড়োতে দৌড়োতে বলে, ‘চল চল, হাসপাতালে নিতে হবে। দেরি হলে বাঁচানো যাবে না।’

শনিবারের চিঠি/আটলান্টা/ জুলাই ১৬, ২০১৬

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১১:১০ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১৬ জুলাই ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com