অর্ধযুগ পর মাতৃভূমিতে প্রাণহীন কোকোঃ জানাজায় লাখো মানুষের ঢল

মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি ২০১৫

অর্ধযুগ পর মাতৃভূমিতে প্রাণহীন কোকোঃ জানাজায় লাখো মানুষের ঢল

 

 


প্রাণহীন কোকো

প্রাণহীন কোকো

শনিবার রিপোর্টঃ অর্ধযুগ পর মাতৃভূমিতে ফিরলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো। তবে জীবিত নয় মৃত।

মঙ্গলবার বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে কোকোর মরদেহ বহনকারী মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের এমএইচ ১০২ ফ্লাইটটি শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মরদেহ গ্রহণ করবেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ এবং আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সম্পাদক গিয়াস কাদের চৌধুরী।

মামলার খড়গ মাথায় নিয়ে প্রায় সাড়ে ৬ বছর ধরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছিলেন কোকো। গত শনিবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৫ বছরে মারা যান তিনি।

গত ওয়ান ইলেভেনের সময় ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সেনানিবাসের বাড়ি থেকে মা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে গ্রেপ্তার হন আরাফাত রহমান কোকো। এর পর ২০০৮ সালের ১৭ জুলাই তৎকালীন সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্বাহী আদেশে মুক্তি পাওয়ার পর চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড যান তিনি। এরপর দেশে না ফিরে তিনি মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান।

২০ কোটি টাকার বেশি অর্থ সিঙ্গাপুরে পাচারে অভিযোগে ২০০৯ সালের ১৭ মার্চ মানিলন্ডারিং আইনে আরাফাত রহমান কোকোর বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০১১ সালের ২৩ জুন আদালত এ মামলায় কোকোকে ছয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। ওই মামলার রায়ে তাকে সাড়ে ১৯ কোটি টাকা জরিমানার আদেশও দেন বিচারক। আওয়ামী লীগ সরকার সিঙ্গাপুর থেকে কোকোর পাচার করা অর্থের একটা অংশ দেশে ফিরিয়ে এনেছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়কর ফাঁকির অভিযোগে কোকোর বিরুদ্ধে ২০১০ সালের মার্চ মাসে আরেকটি মামলা করে। এছাড়াও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কোকোর বিরুদ্ধে গুলশান থানায় দু’টি চাঁদাবাজির মামলা এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদক একটি মামলা করে। আর সোনালী ব্যাংকের ঋণখেলাপের মামলায় বড়ভাই তারেক রহমানের সঙ্গে এবং গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে কোকোও আসামি। এসব মামলার কারণে কোকো বিদেশে অবস্থান করছিলেন। মাঝেমধ্যে মাকে দেখতে উদগ্রীব হতেন কোকো। ফিরে আসতে চাইতেন মায়ের কাছে, ঢাকায়। দেশে ফিরলেই তাকে কারাবন্দি হতে হবে- এ জন্য পরিবারের সদস্যরা তাকে আসতে দেননি। কিন্তু এবার আর আটকে রাখতে পারলেন না। কোকো ফিরেই এলেন মাতৃভূমিতে, লাশ হয়ে।

 

সজল নয়নে ছেলেকে চিরবিদায়

Koko 02

খালেদা জিয়া ছেলেকে শেষ বিদায় দিচ্ছেন

গুলশানে নিজ কার্যালয়ে ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে চোখের জলে বিদায় জানালেন শোকে মুহ্যমান মা খালেদা জিয়া ও পরিবারের অন্য সদস্যরা। মরদেহকে পাশে রেখে খালেদার মোনাজাতের পর কোকোর মরদেহ জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বাদ আসর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

এর আগে মঙ্গলবার বেলা ১টা ৪০ মিনিটে কোকোর লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করে গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে। ১টা ৪৮ মিনিটে অ্যাম্বুলেন্স থেকে মরদেহ নামানো হয়। সোয়া ২টায় ছেলের লাশ দেখতে নিচে নামেন খালেদা জিয়া। হৃদয়ের সবটুকু স্নেহ ঢেলে দিয়ে বরণ করে নেন নাড়িছেঁড়া ধনকে। তবে যে কোকোকে আজ তিনি কাছে পেলেন তা তিনি চাননি কখনো।

কফিনে থাকা ছেলের মুখে হাত রেখে বেশ কিছুক্ষণ কাঁদেন খালেদা জিয়া। তারপর দুই হাত তুলে ছেলের জন্য আল্লাহর কাছে মোনাজাত করেন। তার সঙ্গে মোনাজাতে শরিক হন পাশে থাকা সবাই। প্রায় ১৫ মিনিট ছেলের পাশে অবস্থান করেন খালেদা জিয়া।

সেখান থেকে বেলা ২টা ৪০ মিনিটের দিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয় থেকে কোকোর লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স বায়তুল মোকাররমের উদ্দেশে রওনা হয়। এ সময় মা খালেদা জিয়া অশ্রুসজল নয়নে গুলশান কার্যালয়ের মূল ফটকে দাঁড়িয়ে ছেলেকে চিরবিদায় জানান।

এদিকে বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে কোকোর মরদেহ বহনকারী মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের এমএইচ ১০২ ফ্লাইটটি শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করে। লাশের সঙ্গে ছিলেন কোকোর স্ত্রী ও দুই মেয়ে, মামা শামীম এস্কান্দার ছাড়াও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালু।

বিমানবন্দরে কোকোর মরদেহ গ্রহণ করেন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, কোকোর চাচাতো ভাই মাহবুব রহমান ও তার শ্যালক  ।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ এবং আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সম্পাদক গিয়াস কাদের চৌধুরীও মরদেহ গ্রহণের জন্য বিমানবন্দরে যান।

 জানাজায়  লাখো মানুষের ঢল

 আরাফাত রহমান কোকোর জানাজায় অংশ নিতে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর ও দক্ষিণ গেটে দলীয় নেতাকর্মীসহ লাখো ও  মানুষের ঢল নেমেছে। দক্ষিণ গেটে মানুষের ঢল বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

Gulshan-Koko-8মঙ্গলবার জোহরের নামাজের পর থেকেই জানাজায় অংশ নিতে বায়তুল মোকাররম মসজিদে সমবেত হতে থাকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ।

এ মুহূর্তে বায়তুল মোকাররম মসজিদে উপস্থিত আছেন- সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারার চেয়ারম্যান বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর বীর উত্তম, গাজিপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র এমএ মান্নানসহ অন্যান্য নেতারা।

বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিন পাশে দোতলার উন্মুক্ত স্থানে একটি অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। এখানেই সবাই তার মরদেহের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।

 সেনা কবরস্থানে দাফনের অনুমতি মেলেনি

বনানী সামরিক কবরস্থান

বনানী সামরিক কবরস্থান

বনানী সামরিক কবরস্থানে কোকোর মরদেহ দাফনের অনুমতি পায়নি বিএনপি। এ নিয়ে দলের সাবেক সেনা কর্মকর্তারা কিছুক্ষণের মধ্যেই গণমাধ্যেমে প্রতিক্রিয়া জানাবেন।

এর আগে সোমবার বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, কোকোকে বনানীর সামরিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। কিন্তু মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত অনুমতি পাওয়া যায়নি।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মরদেহ নিয়ে একটি বিশেষ ফ্লাইট বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে ঢাকা পৌঁছে।

ঢাকায় পৌঁছার পর কোকোর মরদেহ নেয়া হবে সরাসরি বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে। এরপর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে বাদ আসর অনুষ্ঠিত হবে তার নামাজে জানাজা।

এর আগে রোববার বাদ জোহর মালয়েশিয়ার জাতীয় মসজিদ নিগারায় তার প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় মালয়েশিয়া বিএনপির নেতারাসহ প্রবাসী বাংলাদেশিরাও অংশ নেন।

কোকোর শেষ ঠিকানা

Koko 03সবকিছু ঠিক থাকলে বনানী কবরস্থানের ১৮৩৮/১৪৭ নম্বর কবরটিই হবে আরাফাত রহমান কোকোর শেষ ঠিকানা।

ইতোমধ্যে কবর খননের সমস্ত কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। বনানীর এ কবরস্থানে কোকোর জন্য নির্ধারিত কবরটি কবরস্থানের ১৮ নম্বর রোডের বি ব্লকে অবস্থান করছে। এ কবরটির একেবারে বিপরীতে রয়েছে বনানীর গির্জা।

এছাড়া কোকোর কবরের জায়গা নির্ধারিত হওয়োর পরপরই কবরস্থান ঘিরে উৎসুক বিএনপি ও ছাত্রদলের কর্মীদের ভিড় ক্রমশ বাড়ছে। ল্যামপোস্টের নিচে কবরটির অবস্থান হওয়ায় ল্যামপোস্টের সঙ্গে হাজার ভোল্টোর একটি লাইট, ৫টি এনার্জি বাল্ব এবং বেশ কয়েকটি রড লাইট সংযোজনের কাজ অব্যাহত রয়েছে।

এর আগে ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান নিবার্হী কর্মকর্তা বিএম এনামুল হক কোকোর কবরের জন্য নির্ধারিত জায়গা ঘুরে যান। এরপরপরই দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে ৮ জন গোরখোদক কবর খননের কাজ শুরু করেন।

উল্লেখ, শনিবার বাংলাদেশ সময় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মালয়েশিয়াতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আরাফাত রহমান কোকো। বুকে ব্যথা ওঠার পর হাসাপাতলে নেয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়।

 

 

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৫:৩৪ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com