ছোট গল্পঃ

অপূর্ণতা

শনিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০১৯

অপূর্ণতা
অপূর্ণতাঃ মাহমুদুল খান আপেল

Litearture 01আজ প্রায় দশ বছর পর রুপা সেজেছে সেই চিরচেনা সাজে। সাজলে তাঁকে পরির মতো দেখায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজেকে দেখে হিংসায় মরে। আজ এত দিন পর কেন সেজেছে সে নিজেও জানে না। তারা এসেছে একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে। বিশাল ব্যালকনির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে রুপা। পাশে দিয়ে যাচ্ছিল অনিক। হঠাৎ রুপা খেয়াল করল অনিক নাক টেনে হালকা করে পারফিউমের ঘ্রাণ নিচ্ছে আর গলা নামিয়ে বলছে, হুমম… আরমানি কোড, আমার খুব প্রিয় ব্র্যান্ড! অচেনা অজানা একজন মানুষের এ রকম মন্তব্যে একটু অবাকই হয় রুপা! লোকটি নির্বিকার ভঙ্গিতে চলে গেল। শুধু মুচকি হাসি দিয়ে তাকিয়ে থাকল রুপা। বেশ অনেকক্ষণ তার চলে যাওয়া দেখছিল সে।
ব্যাপারটি একটু ভাবিয়ে তুলল রুপাকে। অচেনা একজন মানুষ পাশ দিয়ে যেতেই সে কি পারফিউম দিয়ে এসেছে সেটা খেয়াল করল। অথচ যে মানুষটার সঙ্গে তার ১২ বছর কাটল, সে একদিনের জন্যও চেয়ে দেখল না কী শাড়িতে তাকে মানায়, সঙ্গে বের হওয়ার সময় সে সাজগোজ করল কিনা!
রুপা দেখতে সুন্দর, এক কথায় নজর কাড়া সুন্দরী। এ পর্যন্ত কোনো ছেলে তাকে দেখে পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকেনি এ রকম কখনো হয়েছে বলে মনে হয় না। চলতি পথে ছেলেদের হরেক রকম মন্তব্য শুনতে শুনতে অভ্যস্ত সে। এসব আর পাত্তা দেয় না আজকাল। বরং মাঝে মাঝে ভালোই লাগে, আফটার অল প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে। তবে এতটা সুন্দর হলেও রুপা কোনোভাবেই অহংকারী না। বরং ভালো লাগা সব গুনই তার মধ্যে বিদ্যমান।
একদিন সে ক্লাস শেষে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরছে। হঠাৎ দেখে নীরস টাইপ একটা ছেলে তাকিয়ে আছে তার দিকে, এ তাকানোটা অন্যদের থেকে ভিন্ন। খুব অস্বস্তি নিয়ে বাসায় ফেরে সে। দুদিন পর বাসায় আসে তার সবচেয়ে অপছন্দের মানুষটি। বড় আপার মামা শ্বশুর। আবারও সেই বিয়ের প্রস্তাব। তবে এবার আর কোনো কিছুতে কাজ হলো না। ছেলে পক্ষ এতই প্রভাবশালী যে তারা কেউ না বলার দুঃসাহস দেখানোর কথা চিন্তাই করতে পারল না। আর না করবেই বা কি করে, ছেলে তার জীবনে কোনো পরীক্ষায় সেকেন্ড হয়নি। ছেলের বাবা যুগ্ম সচিব। ছেলে সম্প্রতি বিসিএস দিয়ে মিনিস্ট্রি অব ফরেন অ্যাফেয়ার্সে চাকরি পেয়েছে। দেখতেও হ্যান্ডসাম, আর কী চাই! ছেলে-মেয়ের কোনো দেখাদেখির সুযোগ না দিয়ে হুট করেই বিয়েটা হয়ে গেল। হাজার যুবকের স্বপ্নের রাজকন্যা নিমেষেই একজন রসকষহীন মানুষের ঘরনি বনে গেল। বিয়ের প্রথম রাতে তাদের মধ্য স্বাভাবিক কোনো কথা হলো না, রুপা নিজেও প্রস্তুত ছিল না কিছু বলার জন্য। ছেলেরও তেমন কোনো গরজ চোখে পড়ল না। তবে ছেলের দিকে চোখ পরতেই তার মনে পড়ল সেই অন্যরকম করে চেয়ে থাকা মানুষটিই তার সামনে বসে আছে। আজ বুঝল সেদিন তার অন্যরকম চেয়ে থাকার মানে। রুটিন ওয়ার্কের মতো রাত কেটে গেল। এভাবে একদিন, পাঁচ দিন, পরদিন, মাস কেটে গেল। প্রথম দিকে রুপা ভাবত ধীরে ধীরে অ্যাডজাস্ট হয়ে যাবে। এরপরও সে নিরেট ভালো মেয়ের মতো সব রকম চেষ্টা করে গেল অ্যাডজাস্ট করতে। বিয়ের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে সে খুব সেজে অপেক্ষা করল, হয়তো আজ ঠিকই একগুচ্ছ টুকটুকে লাল গোলাপ নিয়ে হাজির হবে। কিন্তু সে আজ ফিরল রাত দুটার দিকে, হালকা এলোমেলো অবস্থায়। কোনো কিছু না খেয়ে, চেঞ্জ না করে, কোনো কথা না বলেই শুয়ে পড়ল সে। রুপা আর ঘুমাল না, ব্যালকনিতে গিয়ে শব্দ করে কাঁদল। কাঁদলে বুকটা হালকা হয়। তারও সে রকম হলো, সেই হালকা ফিলিংসে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। ওই রাতেই সে নিজেকে বদলে ফেলল। আজ থেকে সে অন্য এক রুপা। যার ভেতরে কোনো স্বপ্ন থাকবে না, ভালো লাগা-মন্দ লাগা কোনো অনুভূতি থাকবে না। শুধু বাঁচতে হয় তাই বাঁচবে। আর কখনো বৃষ্টির দিনে কিশোরীর মতো করে বৃষ্টিতে ভিজতে চাইবে না, চাঁদের আলোয় বসে গুন গুন গান গাইতে বা কোনো প্রিয় কবিতা আবৃত্তি করতে চাইবে না। এ সত্যিই অন্য এক রুপা। এভাবে না চললে জীবনের বাকিটা পথ পাড়ি দেওয়া বেশ কঠিন তার জন্য। বিয়ের পর এই দুই বছরে যে স্বামী নামক মানুষটার সঙ্গে একদিনের জন্যও রুটিন কথা ছাড়া, কোনো ভালো লাগা, মন্দ লাগার কথা হয়নি। সেই মানুষটাকে নিয়ে স্বপ্নের জাল বোনা সত্যিই বোকামি।
রুপার স্বামী আবির উচ্চ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ। বউয়ের সঙ্গে স্বাভাবিক কথা বলা তার ব্যক্তিত্বের লিস্টে নেই। লোক দেখানো যা কথা সেটুকুই বলে। আসলে সে মানুষটাই এমন। সফট ফিলিং নেই বললেই চলে। সেখানে রুপা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক মানুষ। যে স্বপ্ন দেখে চাঁদের আলোয় সমুদ্র সৈকতে চিকচিকে বালিতে তার হাত ধরে খালি পায়ে হাঁটবে, প্রিয় কবিতা আবৃত্তি করে তাকে শোনাবে। এত এত ধন সম্পদের দিকে তার নজর নেই। তার চাওয়া হৃদয় ভরা ভালোবাসায় পরিপূর্ণ একজন মানুষ। যে তার বাজার খরচের বাজেট থেকে কষ্ট করে ৫০ টাকা বাঁচিয়ে লাল গোলাপের গুচ্ছ নিয়ে বাসায় ফিরবে। সে আসা তার পূর্ণ হয়নি, এমনকি তার ধারের কাছেও নেই বাস্তবতা। এভাবেই কেটে গেল তার বিয়ের ১২ বছর। অথচ মনে হয় এই সেদিনের কথা। বিয়ের ঠিক আগের দিন তার শেষ দেখা হয় আনিসের সঙ্গে। সবকিছুই ঠিক ছিল, তারা রাতে পালিয়ে যাবে, সোজা চলে যাবে সেন্ট মার্টিনে। বিয়ে হবে যাওয়ার পথে কোথাও।
আনিসের সঙ্গে রুপার দেখা হওয়াটা ছিল কিছুটা নাটকীয়। বই মেলায় আর দশটা ছেলের মতো আনিসও ঘুরছিল, হঠাৎ চোখ পরে রুপার ওপর। সে থমকে যায়। আনিসের ধারণা ছিল মেয়েদের সৌন্দর্যের একটা লিমিট থাকে, রুপাকে দেখে তার সে ধারণা পাল্টে যায়। শরীরে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। কিন্তু সে যখন রুপার পাশে এসে দাঁড়ায় তখন এমন ভান করে, যেন সে কিছুই দেখেনি। কেমন কেয়ারলেস একটা ভাব। তার এই ইগনোর করার কৌশল কাজে লেগে যায়। রুপার গা জ্বলতে থাকে। আজ পর্যন্ত কোনো ছেলে তাকে দেখে এই আচরণ করেনি। রাগে গজ গজ করতে করতেই তার চোখে চোখ পরে আনিসের। চোখ তো না যেন মায়ার সাগর। নিমেষেই হারিয়ে যায় রুপা। নিজেকে সামলে নিয়ে সেখান থেকে দ্রুত চলে যায়। কিন্তু কেমন যেন লাগছে, এ রকম সাদামাটা একটা ছেলের চোখে এত কিসের মায়া! রুপার ভাবনাগুলো অন্যরকম হতে থাকে। বাসায় এসেও সেই একই ভাবনা। আনিসও ফলো করতে করতে রুপার বাসা পর্যন্ত চলে আসে। রুপাও সেটা খেয়াল করে। আজ প্রথম কারও ফলো করায় কোনো অস্বস্তি লাগছে না, বরং মনে হচ্ছে কেমন ভালো লাগা একটা আভা তাকে ফলো করছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে রিকশা উড়ে উড়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করছে পেছন ফিরে দেখতে। কিন্তু সাহস হয় না।
এরপর মাঝে মাঝে দুর থেকে দেখা দেখি, এটুকুই। একদিন বলা নেই কওয়া নেই সামনে এসে হাজির হয় আনিস। ছোট্ট করে একটা হাসি দিয়ে বলে, খুব ইচ্ছে করছে ধানমন্ডি লেকের ধারে বসে ফুচকা খেতে। সেটাই প্রথম কথা তাদের মধ্যে। রুপা কিছুই বলতে পারে না। আনিস রিকশার পাশের সিটে এসে বসে। রিকশা চলতে থাকে অজানার উদ্দেশ্যে। সেই তাদের নতুন পথ চলার শুরু। এরপর প্রায় দুই বছর চলে তাদের স্বপ্নের বুনন। জানালার পর্দার রং কী হবে থেকে শুরু করে ছেলে-মেয়ের নাম পর্যন্ত ঠিক করে ফেলে তারা। তাদের যত দিন দেখা হয়েছে আনিস ভুল করেও কোনো দিন লাল গোলাপ আনতে ভোলেনি। সে জানে লাল গোলাপ রুপার খুব প্রিয়। সেই গোলাপের দিকে চোখ পড়তেই রুপার অজানা এক ভালো লাগায় মনটা ভরে ওঠে।
রুপার বিয়ের আগের রাতে, যেদিন তাদের পালিয়ে বিয়ে করার কথা, সেদিন আনিস আসেনি। রুপা প্রায় রাত ১০টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে ফিরে আসে। পরে শুনেছে সেদিন আনিসের বাবা হঠাৎ স্ট্রোক করে মারা যায়। কিন্তু যখন সে এটা শোনে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। আর কিছুই করার ছিল না তার, শুধু দিনের পর দিন ঘরের এক কোনায় বসে ফুপিয়ে কাঁদা ছাড়া।
আনিসের বিয়ে হয় খুব সুন্দরী এক মেয়ের সঙ্গে। পরিবারের সবাই অনেকটা জোর করেই এই বিয়ে দেয়। বিয়ের আগে কথা বলার সুযোগ হয়নি তাদের। বিয়ের রাতেই আনিস আবিষ্কার করে মেয়ে তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার সব স্বপ্ন কেবল সাজগোজ আর রূপ চর্চা নিয়ে। একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে আনিস লাল গোলাপ নিয়ে বাসায় হাজির হয়। হাতে ফুল দেখে অনিসের বউ তিতলি মুখ ভেংচি দিয়ে বলে, এগুলো কি! এ যুগে কেউ ফুল কেনে বউয়ের জন্য। তার চেয়ে যদি সেদিনের ডায়মন্ডের লকেটটা কিনে আনতে! ফুলগুলো ফেলে দিয়ে আনিস ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। হঠাৎ মনটা বিষণ্ন হয়ে যায় তার। এরপর সে আর কখনো ফুল নিয়ে বাসায় ফেরেনি। বেঁচে থাকতে হলে সব চাওয়া কবর দিয়েই বেঁচে থাকতে হয়। না হলে সেই চাওয়া ঘুণ পোকার মতো কুড়ে কুড়ে খেয়ে শেষ করে ফেলে জীবনকে। এভাবেই চলছে তার জীবন। অফিস থেকে ফিরে তার একমাত্র মেয়েটাকে নিয়ে বের হয়। বাসায় ফিরে মেয়ের হোমওয়ার্ক রেডি করা, মেয়েকে ঘুমিয়ে, নিজে ঘুমাতে যায়। তিতলি অনেক রাত পর্যন্ত টিভি দেখে কোনো এক সময় ঘুমাতে যায়।
রুপার সবচেয়ে ভালো লাগার জায়গাটি ছিল তার ফুটফুটে ছেলেটি। সে এসে যখন মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলে, আম্মু তোমার কি মন খারাপ?—না তো বাবা! তাহলে সব সময় মন বিষণ্ন করে বসে থাকো কেন? আমি তো এমনিই বাবা। আমি কিন্তু চাইলে নিমেষেই তোমার মন ভালো করে দিতে পারি। ওরে পাকনা বুড়ো। দেখি একটু, কী করে তুই আমার মন ভালো করিস! আমাকে কোলে নিয়ে দশটা চুমু দাও, দেখবে এতগুলো ভালো লাগবে তোমার। রুপা তৃপ্তির হাসি দিয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে ছেলের দিকে।

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা / ডিসেম্বর ২১,২০১৯


Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০১৯

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com