ছোট গল্পঃ

অন্তরালে তুমি

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০

অন্তরালে তুমি
অলংকরণঃ কানাই ব্যানার্জি

” অ নি,শোনো আজকে পারলে একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বাড়ি আসতে পারবে গো?”খাবার টেবিলে বসে পূর্বা অনির্বাণ কে জিজ্ঞেস করে।অনির্বাণ বলে”তুমি একা চলে গেলেই তো পারো আমি আবার কেনো যাবো, এমনিতেই আজ অফিসে অনেক কাজ আছে” এই বলে টেবিল থেকে উঠে যায় অফিসের ব্যাগ টা নিয়ে,বুঝতে পারে যে পূর্বার মুখটা কেমন উদাস হয়ে গেছে….অনির্বাণ বলে”আমি গাড়ি পাঠিয়ে দেবো তুমি চলে যেও”বলে বেরিয়ে গেলো….. পূর্বা আর কিছু বলেনি আসলে বলতে চায়নি কারণ সব সময় সব কিছু জোর করে হয়না।

গাড়িতে করে অফিসে যাওয়ার সময় অনির্বাণ ভাবতে লাগলো এটা কি ঠিক করছে ও পূর্বার সাথে?পূর্বা কোনোদিনই তেমন কিছু চায়নি অনির্বাণের কাছে আর যখনই কিছু বলে সব সময় পূর্বাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে অনির্বাণ।আর পাঁচজন এর মত করে নিজেদের সম্পর্কটা গুছিয়ে নিতে পারেনি অনির্বাণ।এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে অফিস এসে গেছে খেয়াল নেই।ড্রাইভার ডাকতে জ্ঞান ফেরে।যাওয়ার সময় বলে”আজ বিকালের দিকে গাড়িটা বাড়ি নিয়ে যেও ম্যাডাম ফোন করবেন তোমাকে আজকে ম্যাডাম একটু বেরোবেন”।


অফিসে নিজের কেবিনে বসে অনির্বাণ আজ সকালের কথা গুলো ভাবতে থাকে।একটা সিগারেট ধরিয়ে বড় জানালাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।কতবার পূর্বা বরণ করেছে সিগারেট খেতে তাও অনির্বাণ ছাড়তে পারেনি চেষ্টা করেও।হঠাত্‍ মনে পড়ে গেলো আজ থেকে বছর চারেক আগের কথা।তখন কলেজ শেষ করে চাকরির চেষ্টা করছে অনির্বাণ সাথে সাইন্সের টিউশন ও করতো।তখন ঋত্বিকা ছিল তার ধ্যান জ্ঞান।তখন অনির্বাণ কত কবিতা লিখেছে ঋত্বিকার জন্য।কত দিন একসাথে হাত ধরে গঙ্গার পারে হেঁটে বেরিয়েছে দুজনে।সব ভালই চলছিল কিন্তু হঠাত্‍ একদিন ঋত্বিকা বললো “শোনো আমাকে বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে।আর তুমি এখনও কোনো ভালো চাকরি পাওনি বাবা আমাদের সম্পর্কটা কোনোদিন মেনে নেবে না আমার জন্য ছেলেও দেখেছে আমি অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি বাড়িতে আমাকে মা আত্মহত্যার হুমকি দিচ্ছে।আমার পক্ষে এই সম্পর্ক রাখা সম্ভব নয় তার থেকে বরং তুমি আমাকে ভুলে যাও।”অনির্বাণ কোনো কথা বলতে পারেনি তখন।দীর্ঘ আট বছরের সম্পর্কের এরকম পরিণতি অনির্বাণ মেনে নিতে পারেনি।কবিতার খাতাটাও ফেরত দিয়ে দিয়েছিল ঋত্বিকা কে বাড়ি এসে একলা চোখের জল ফেলেছিল শুধু।কতদিন রাতের বেলায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্যাকেট প্যাকেট সিগারেট শেষ করেছে।সব যেমন চলছিল তেমনই চলছে।ছাত্র ছাত্রীদের সাথে বেশি সময় কাটাতো ওদের এক্সট্রা ক্লাস নিতো রোজই। কিন্তু মা সব বুঝতে পেরে গেছিলো।

কিছুদিনের মধ্যেই ঋত্বিকার বিয়ে হয়ে যায়। একদিন রাতে মা ঘরে এসে দেখে ছেলে বিছানায় শুয়ে আছে মা এসে পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে”বাবু যা হয় ভালোর জন্যই হয় মাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষন কেদেছিল অনির্বাণ।”কাদিস না বাবু জীবন বড়ো কঠিন তোকে লড়তে হবে হেরে গেলে চলবে না”মায়ের এই কথাটাই অনির্বাণকে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস দিয়েছিল।তারপর সে লড়াই করে এই কোম্পানি তৈরি করে।আজ তার কোম্পানির নাম চারিদিকে।সবাই এক ডাকে চেনে। দুবছর আগে পূর্বার সাথে বিয়ে হয় অনির্বাণের ।মায়ের পছন্দ তাই না করেনি অবশ্য পূর্বার মায়া ভরা মুখটা অনির্বাণ এর খুব ভালোলাগে।পূর্বা শুধু বলেছিল সে পড়তে চায়।অনির্বাণ বলেছিল”নিশ্চয়ই পড়বে আমি পড়াবো তোমাকে।”

দরজায় নক্ করে সেক্রেটারি তাতেই অনির্বাণের জ্ঞান ফেরে।”স্যার কালকে একটা ছোট পার্টি হবার কথা আপনার মনে আছে নিশ্চয়ই? ম্যাডামকে নিয়ে আসতেই হবে এবার।”সেক্রেটারি হাসি হাসি মুখে বলে। “নিশ্চয়ই আসবেন আপনাদের ম্যাডাম আমি তাকে নিয়েই আসবো”অনির্বাণ বলে।অনির্বাণের এই সেক্রেটারি টি খুবই ভাল মেয়ে অতি সাধারণ আর ভদ্র এবং মিশুকে।আগে যতজন সেক্রেটারি ছিল সবার নজর অনির্বাণের দিকে থাকতো কিন্তু এ একদম অন্যরকম।

অফিসের নিচে এসে দেখে গাড়ি অপেক্ষা করছে।ড্রাইভার বললো ম্যাডাম আজকে বেরোননি। বাড়ি ফিরতে পূর্বা বললো”তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও আমি খবরটা গরম করে আনছি”।খাবার টেবিলে বসে অনির্বাণ বললো”আজ তুমি বেরোলে না?”পূর্বা বললো”এমনি”।অনির্বাণ এবার বললো”কালকে একটা পার্টি আছে অফিসে তুমিও যাবে আমার সাথে অফিসে সবাই খুব জোর করছিল”।পূর্বা বললো “আচ্ছা”।মনে মনে ভাবলো”ওরা বলছে তাই তুমি আমাকে নিয়ে যাচ্ছো তুমি নিজে থেকে আমাকে নিয়ে যেতে চাওনা”…..

পরের দিন পার্টিতে যাওয়ার সময় পূর্বাকে নীল শাড়িতে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। আজ ড্রাইভারকে ছুটি দিয়েছে অনির্বাণ নিজেই গাড়ি চালিয়ে যাবে আজকে।পূর্বা বললো”অনি আজ কতদিন পরে তুমি আর আমি একসাথে কোথাও যাচ্ছি”।অনির্বাণ বলল”হুমম”।এরকম উত্তর আশা করেনি পূর্বা। পার্টিতে পৌঁছে সবার সাথে আলাপ করিয়ে দিল অনির্বাণ।একটা টেবিলে পূর্বাকে বসিয়ে দিয়ে বললো তুমি বসো আমি আসছি একটু।পার্টি থেকে বাইরে এসে সবে একটা সিগারেট ধরাতে যাবে এমন সময় দেখে সামনে ঋত্বিকা দাড়িয়ে।ঋত্বিকা বললো”কেমন আছো অনির্বাণ?শুনলাম তুমি নাকি বিয়ে করেছো?”।”হ্যাঁ,তুমি কেমন আছো?”জিজ্ঞেস করলো অনির্বাণ।”ভালোয়াছি,তোমার কথা খুব মনে পড়ে আমার।আচ্ছা আমার কথা তোমার মনে পড়ে অনির্বাণ?”জিজ্ঞেস করে ঋত্বিকা।”একদম না,তুমি আমার মনের অন্তরালে চলে গেছো ঋত্বিকা যেখান থেকে তোমার ভাবনাও ফিরিয়ে আনা আমার পক্ষে অসম্ভব।আমি আর ভাবতেও চাইনা আমার জীবনের ফেলে আসা দিনের কথা।তুমিও ভুলে যাও নিজের জীবনে খুব ভালো থাকো।আমি চলি আমার স্ত্রী আমার জন্য অপেক্ষা করছে।”বলে অনির্বাণ চলে আসে।আজ এই কথা গুলো বলার পরে নিজের মনটা খুব হালকা লাগে অনির্বাণের।কেমন একটা খুশি খুশি জোয়ার বয়ে যায় মনের মধ্যে।ফিরে এসে পূর্বার হাত ধরে বলে চলো পূর্বা আজ আমরা একটা জায়গায় যাবো।এই প্রথম অনির্বাণ পূর্বার হাত ধরলো।পূর্বার মনে তখন রামধনুর রঙ ছড়িয়ে পড়েছে।

গাড়ি ছুটে চলেছে ফাঁকা রাস্তা ধরে।একটা ফাঁকা জায়গায় গাড়ি থামালো অনির্বাণ।পূর্বাকে হাত ধরে নামালো গাড়ি থেকে বললো”চলো পূর্বা”।গাড়ি থেকে নেমে একটু এগিয়ে একটা বেঞ্চে বসে দুজনে।অনির্বাণ বলে”জানো তো পূর্বা আমি জীবনে অনেক কিছু হারিয়েছি কিন্তু একটা দামী সম্পদ ও পেয়েছি সেটা তুমি পূর্বা।আমি জানি আমি তোমাকে খুব কষ্ট দিয়েছি কিন্তু বিশ্বাস করো আমি ইচ্ছা করে করিনি,আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলার ভয় পেতাম তাই দূরে পালিয়ে বেরিয়েছি কিন্তু আর না।”আই লাভ ইউ পূর্বা”আমাকে ক্ষমা করো তুমি।পূর্বা বললো “ধুর বোকা যাকে এত ভালোবাসো তাকে তুমি কষ্ট দিতেই পারনা।”। অনির্বাণের কাধে মাথা রেখে রাতের পূর্ণিমার চাঁদের আভা গায়ে মেখে তাঁরা ভর্তি আকাশের দিকে তাকিয়ে পূর্বা বললো”আচ্ছা অনি আমরা সারাজীবন এইভাবে থাকতে পারবো তো?”অনির্বাণ, থাকবো তো কেউ আমাদের সম্পর্কটা ভাঙতে পারবেনা।”এই বলে পূর্বার কপালে একটা চুমু এঁকে দিয়ে অনির্বাণ বললো “চলো বাড়ি যাই”।

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা/ সেপ্টেম্বর ১২, ২০২০

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৮:৩২ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com