শনিবার সাহিত্যঃ ছোট গল্প

অতিথিপরায়ণ

শনিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২০

অতিথিপরায়ণ
অতিথিপরায়ণঃ পারিজাত ব্যানার্জী

“অতিথি দেবঃ ভবঃ— অর্থাৎ অতিথি দেবতা শব্দেরই প্রতিরূপ। কথায় বলে, ঈশ্বর নিজে যখন আতিথ্য গ্রহণ করতে চান, তখনই কোনও না কোনও রূপে তিনি তাঁর ভক্তের মনের দোরগোড়ায় হানা দেন— অতিথি রূপে। তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার অর্থ তাই স্বয়ং ভগবানকেই অবহেলা করা।”

মা চুপ করে যান। জানি, এই চুপ করে থাকা স্তরের পরিমাপখানি বড়ই সাময়িক— আসলে, কথারা এই সময়ে জমা হতে থাকে তাঁর অভ্যন্তরে, বলতে গেলে, তাদের শুধুমাত্র কোনও বহিঃপ্রকাশ থাকে না। বা হয়তো, আমিই কেবল তা শুনতে পাই না! কত কথা তো জমে জমে আজ একগুচ্ছ কথা হয়ে ঠাঁই করে নিয়েছে আমার মননের গভীরেও। ইচ্ছে হয় কখনও কখনও সেসব কথা ভাগ করে নিই আমার ঘরের লাগোয়া বাঁধানো বারান্দায় বড় হয়ে ওঠা দুধে আলতা রঙের এই এত্ত বড় বড় জবাফুল দেয় যেই গাছটা— তার সঙ্গে।


সেও তো মা— প্রতিদিন জন্ম দিয়ে চলেছে একগুচ্ছ জবা— ঈশ্বরেও বেদীর ’পরে তাই দিয়ে সাজানো হচ্ছে অর্ঘ্য। আচ্ছা, তবে কি এই গাছের কাছেও ক্ষণিকের অতিথিই কেবল তার রাঙাজবারা? ঈশ্বরকে তুষ্ট রাখতে প্রতিদিন যাদের বৃন্তচ্যুত করে চলেছি নির্মমভাবে এই আমি, আমরা– বা একাগ্র ভাবে এই মনুষ্যত্বে ভরপুর সম্প্রদায়?

মা কি বুঝলেন, কে জানে? হাওয়ায় উড়িয়ে দিলেন একগোছা হালকা হাসি। “পাগলী মেয়ে আমার। ঈশ্বর কি কখনও বলেন নাকি আমায় সাজাও? আমায় গোছাও। তিনি কি বলেন, তোমার ঘরের অতিথিকে আমার জন্য পর করো? ওই জবারা ওই গাছের আত্মজ, অতিথি নয়। গাছ তাদের নিয়ে শোক করে, তাদের হারিয়ে যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়। সব মায়েরাই হয়। তবু, এক্ষেত্রে তাকে কি অতিথি আদৌ বলা চলে? তুই কি আমার ঘরে অতিথি হিসাবে ছিলি, বল? ছোট থেকে কোলে পিঠে মানুষ করলাম, মনে আছে, তোর বুকে যাতে ঠাণ্ডা না লাগে কেমন তেল মালিশ করতাম?

এক বোতল সর্ষের তেল তোর মাথার কাছেই সবসময় রাখা থাকত। কখন আপদ বিপদ ঘটে, সেই ভয়। আবার যখন তুই একটু বড় হলি, তোর পিঠ জোড়া ঘন কালো চুলের ঢেউ উত্তাল হয়ে উঠল, নিজের হাতে রোজ বিকেলে তা আঁচড়ে জট ছাড়িয়ে বেঁধে দিতাম।মনে করে দেখ, তখন একটাও চুল পড়েনি কিন্তু তোর। অথচ, তুই একটু বড় হতেই হঠাৎ একদিন কেমন বলে বসলি বল, ‘অমন করে জোড়া বিনুনি আর বেঁধে দিও না তো মা, লোকে হাসে। আজ থেকে আমার চুলের যত্ন আমিই নেব।’ বুঝলাম, আমার প্রয়োজন ফুরচ্ছে তোর জীবনে।

একটা কথা বলব তবু, তোর চুলও কিন্তু সেইদিন থেকে হিসাব কর, দেখবি, কেমন পর হয়ে গেল তোর।সত্যি কথা বলতে এই সামান্য হলেও যখন দূরত্ব এসে দাঁড়ায় কোনও জুটির প্রাণকেন্দ্রে— কোথাও গিয়ে ছিন্ন হয় যোগসূত্র, তবু টান রয়ে যায় — তখনই তো অপরজন কেমন যেন চোখের সামনে ‘অতিথি’ হয়ে যায় বল! একে একে সব চুল ঝরে গিয়ে আজ যা পড়ে রয়েছে, তা যেন সেই একগোছা ইতিহাসের সাক্ষ্যবহ প্রেতাত্মা।

সে হিসাবে ভেবে দেখলে অবশ্য জানিস তো, ওই জবাফুলগুলো তোর কাছে কিন্তু অতিথি। তোর ঘরে কদিনের জন্য আসে,তোর ঘর আলো করে থাকে, তারপর একদিন প্রয়োজন ফুরলেই ফিরে যায় তার অনন্তলোকে। এরমধ্যেই তুই কখনও তাকে তুলে যদি ঝুটো ঈশ্বরের পায়ে দিয়েও দিস— তাতে দোষের কিছু নেই। এক্ষেত্রে গাছের ফুলের উপর যে টান, আমার তোর উপর যে জোর — সেইটের কিন্তু বড় অভাব।”

আমি তাকিয়ে থাকি মায়ের দিকে। ক্লান্ত লাগে বড়। কথাগুলো যে কিভাবে গুছোতে হয়, তাও বোধহয় আমার মায়ের থেকেই শেখা। শুধু কখন যে তা বলতে হয়, কোন আঙ্গিকে তা পরিবেশন করলে বাড়তি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়, সেইটে জানি না। এসব মায়ের আসলে বরাবরই ছিল অজানা। তাই ভাবনার উড়ানে চড়ে কথার মেলায় ভাসি— বোঝার চেষ্টা করি ঠিক কতখানি টান কমলে ’পরে তবে কোনও আত্মার স্বীকৃত সম্পর্ক ক্ষণিকের অতিথি হয়ে ভেসে বেড়াতে পারে স্বপ্নের আস্তরণ চাপিয়ে।

এই যে জবা গাছের ফুল তার অতিথি নয়— অথচ তারা আমার অতিথি, তাই বা কেমন করে হয়? অতিথি যদি দেবতারই প্রতিরূপ, তবে তাকে টেনে হেঁচড়ে ছিঁড়ে কিকরে আবার ঈশ্বরের থানই সাজাই তা দিয়ে প্রকারান্তরে? ঠোঁট দুটো আপনা থেকেই নড়ে ওঠে— “মা, তুমি ভুল বলছো। এ কেমন অতিথি আপ্যায়ন— তুমিই একবার খানিক ভেবে বল তো?”

জানালার বড় বড় সবুজ পাল্লা দু’টি টেনে বন্ধ করেন মা। যেন কিছুই শুনতে পেলেন না আমার কথা এমন একটা ভাব ফুটিয়ে হঠাৎ তিনি বলে ওঠেন, “বুঝলি, ঝড় আসছে বোধহয়। আমি বরং চলি, কেমন? আর শোন চুলে একটু তেল গরম করে মাঝে মাঝে লাগিয়ে নিস, কেমন? দেখবি, গোড়া শক্ত হলে চুল পড়ার সমস্যাও কেমন কমে যাবে– আর অত সহজে সব উঠবে না।”

এতক্ষণে নিশ্চিত হলাম, মা ভুল বলছেন। বা আসলে, এই মাতৃত্বের সমস্ত ভাবনা জুড়ে যে তোলপাড় করা ভালোবাসা— এর সমস্ত আবরণ ঘনিয়েই পাক খেয়ে চলে কেবল ভ্রম। কিছুই আসলে দীর্ঘস্থায়ী নয়। কোথাও টান থাকুক, আর নাই বা থাকুক— সম্পর্ক টানাটানি করে তা যতই জোরালো বা জোড়াতাপ্পি দেওয়ার ব্যবস্থা হোক না কেন, আসলে সবকিছুর অস্তিত্বেই লাগে ভাটার টান।

সব সম্পর্কিত সময়ের নিরিখে দেখতে গেলে ক্ষণিকের— সব আলাপ সেই আওতায় সাময়িক— এ পৃথিবীর বুকে ঘটে চলা সব ঘটনা অঘটনেরই কোনও উৎস শেষ নেই। এই যে এত যত্ন করে তেল গরম করে চুল ভালো রাখার ব্যবস্থা— আসলে, এও অতিথিসেবা। শ্মশানের হাঁ করা গহ্বরে যখন আস্তে করে তলিয়ে যেতে দেওয়া হয় মৃতদেহ, তখন গলিত লাভার মতো সবচেয়ে আগে হইহই করে পুড়ে হলকার সাথে উপড়ে আসতে চায়, তা ওই অত সাধের বাহারি এলোকেশ!আমি দেখেছি— স্পষ্ট অনুধাবন করেছি, খুব কাছের থেকে দূরে যেতে যেতে মা-ও কেমন ‘অতিথি’ হয়ে গেছে অবশেষের পরে থাকা এই আধমরা বেলায়।

জানালাটা আবার হাট করে খুলে দিই। আসুক ঝড় – প্রলয়, পরোয়া করি না। স্বপ্নের ঘোরালো সিঁড়ি বেয়ে আজও ফুরসত পেলে মা যে দাঁড়ায় এসে ওই স্বপ্নের আনমনা একফালি জানালাতেই— অতিথি রূপে।

টান মরে গেলে এই আতিথেয়তার যে কোনোদিন মরণ হয় না। কক্ষনও না।

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা/ জানুয়ারি ১৮, ২০২০

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৮:০৩ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২০

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com