বিজয় দিবসের বিশেষ গল্প

অজানা

বুধবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২০

অজানা
অজানাঃ নন্দ কিশোর সাহা

অবশেষে একটা বাসা পাওয়া গেল। ভাড়াটা বেশ  কম। মালিক অমায়িক। বাড়িটা বড়। চাকরি জীবনের প্রথম পাঁচ বছর কেটেছে স্ত্রী-কন্যাকে দূরে রেখে । এখন আর ভালো লাগেনা।
বদলি হতেই তাই সিদ্ধান্ত নেয় বাড়ি ভাড়া নেওয়ার। গতকালই সব গুছিয়ে নিয়েছে। লোড শেডিং তো লেগেই আছে। বিদ্যুৎ চলে যেতেই সেলিম শুয়ে পড়ে ।
দ্রুত ঘুম নামে ওর চোখে। গভীর রাতে চারিদিকে যেন জমাট বাঁধা অন্ধকার। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক । সুনশান নীরবতা।
বাথরুমে যাওয়ার জন্য সাবধানে বিছানা ছাড়ে।  চার বছরের কন্যা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। নতুন ড্রেসটা আর ছাড়তে চায়নি। বাথরুম থেকে বের হতেই দেখে অনু এগিয়ে আসছে তন্দ্রা জড়িত চোখে।
-কিরে মা, নিজেই উঠেছ?
অনু মৃদ্যু হাসে । বাবার পাশ দিয়ে নিরুত্তর এগিয়ে যায়। সেলিম মেয়ের জন্য অপেক্ষা করে। তারপর দেরি দেখে ফিরে আসে। পিপাসা পেয়েছে। টেবিল থেকে গ্লাস নিয়ে জগ  থেকে পানি ঢালে। ঢক ঢক করে গিলে ফেলে।
মশারীর ভিতরে ঢুকতে গিয়ে চমকে ওঠে  সেলিম। অনু শুয়ে আছে। যেমন শুয়ে ছিল তেমনি করে। তাহলে কী ও বাথরুমে যায় নি? কিন্তু তা কি করে হয়। নাকি হ্যালুসিনেশন? কিন্তু কোনটা ঠিক? অনুমান করতে পারেনা।
অনুর গায়ে হাত দিয়ে পরীক্ষা করে। অনুভব করে শরীরের উত্তাপ আর কোমলতা। ঠিকই আছে মনে  হয়। ভয় পায়। সাহস হয়না আর বাথরুমে গিয়ে দেখে আসতে। রুমের দরজা আটকে শুয়ে পড়ে। লাইট অফ করতে পারেনা। অন্ধকারকে সবাই ভয় করে।
ঘুম আসেনা। অঞ্জনাকে কিছু বলা যাবে না, ভয় পাবে। অথবা পাগল মনে করবে। সারাদিন মনটা খারাপ হয়ে আছে। বলতে পারেনা কাউকে। কিন্তূ ভারী অদ্ভুত কাণ্ড।
কিন্তু কেমন এটা হল? সেলিম বুঝতে পারেনা।
পরদিন ভোর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দেখে অনু কোন দাঁড়িয়ে আছে গেটের কাছে। স্পষ্ট অনুমিত হয় বাবার প্রত্যাশায় এই অপেক্ষা।
-কিরে মা, দাঁড়িয়ে কেন?
-আমার বই এনেছ, বাবা?
-ও এই জন্য?
-হ্যাঁ, বই দাও।
-কাল এনে দেব। আজ আর সময় পায়নি দোকানে যেতে।
কথা বলতে বলতে গেট টেনে দেয় সেলিম।
-ঠিক আছে, কাল এনে দিও।
হাতে ভারী ব্যাগ। তাই আর দেরি না করে ভিতরের  দিকে পা বাড়ায় সেলিম।
-গেট আটকাও নি তো বাবা।
-ও তাই তো। আচ্ছা আটকাচ্ছি।
-থাক বাবা। তুমি যাও, আমি তো আটকাতে পারি।
-তাই নাকি? আচ্ছা আটকে দাও।
এই বলে ভিতরে দিকে এগিয়ে যায় সেলিম। বারান্দা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই ছুটে আসে অনু। বাবা , বাবা, মা পিঠা বানাচ্ছে। ভারী সুন্দর হয়েছে।
চোখ স্থির হয়ে যায় সেলিমের। এ সব হচ্ছে কী? এযে ভয়াবহ পরিস্থিতি। মেয়ের কথায় উত্তর দেয়া হয় না। ভাগ্য ভাল ওরা কেউ বুঝতে পারছে না। একদিন বুঝে ফেলবে। সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টির আগে পালাতে হবে। কিন্তু কী করে? বাসা ভাড়া পাওয়া তো মুশকিল।
স্ত্রী জানতে পারলে তো একদণ্ডও থাকতে চাইবে না। সারা রাত আর ঘুম এলো না। রক্তচক্ষু নিয়ে গেল অফিসে। বিষণ্ন মন।
আজাদ সাহেব জানতে চান মনের খবর। সব শুনে তিনি বললেন – অফিসের কাছে একটা বাসা আছে। ভাড়াটা একটু বেশি হতে পারে।
-কোন অসুবিধা নেই।
পরদিনই বাসা বদল হয়ে গেল নির্বিঘ্নে।
-সেলিম লাঞ্চে যাবে না?
-আজাদ ভাই, একটু পরে যাব।
-বুঝেছি । ঝামেলায় কেটেছে। টিফিন বক্স আনোনি। -ঠিক তাই।
-এসো দুজনার হয়ে যাবে।
-থাক। আপনি খেয়ে নেন।
-না, থাকবে কেন? তোমার জন্যও তো এনেছি। জানি তো বাসা বদল এর ঝক্কি-ঝামেলায় ছিলে।
-ও তাই নাকি? হাঁ, তা একটু  ছিলাম।
-তোমাকে সব বলবো। খেতে খেতে বলবো।
খাওয়া শেষ হতেই আজাদ বললেন- শোনো, কাল তোমাকে কিছু বলিনি। আজ বলছি।
একাত্তরের শেষভাগে ওখানে মিলিটারি এলো। যে যার মত পালালো। অনেকেই মারা পড়ল। ও বাড়িতে মা-বাবা দুজনকে একসাথে গুলি করে মেরে ফেলল। মা শিকলটা টেনে রেখে এসেছিল গোলাগুলি শুনে। কেউ আর ফিরে যায়নি। লাশ দুটো অনেক দিন পড়েছিল।
লোকজন ফিরে আসতেই পেল পচা গন্ধ। ঘরের ভেতর থেকেও গন্ধ আসছে। মেয়েটি মরে গেছে। চার বছরের মেয়ে। না খেয়ে মরে গেছে।
-বড়ই মর্মান্তিক, আজাদ ভাই।
-হা। বড়ই মর্মান্তিক । তারপর মাঝে মাঝে মেয়েটাকে দেখা যেত। কখনো সন্ধ্যায় কখনো দুপুরে অথবা গভীর রাতে। কেউ আর ও বাড়িতে থাকতে পারতো না।
-সস্তায় পাওয়া গিয়েছিল বাড়িটা।
-ভাড়াটে  পেয়েছিল এটাই ভাগ্য ।
আজাদ বলেন-  কেউ আর থাকে না এখন।
সেলিম জানতে চায়- কেউ থাকতে চাইবে এই ভূতুরে বাড়িতে? না জানলে আমার মত। সেলিম হাসতে থাকে।
আজাদ বলেন-আমাদের স্বাধীনতা! আজাদের চোখে একরাশ বিষণ্ণতা।
-সবাই তো জানে না আজাদ ভাই।
-হ্যাঁ সেলিম, আমাদের স্বাধীনতার কত অজানা গল্প আছে।

বাগেরহাট।


শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা/ ডিসেম্বর ,  ২০২০

লেখকের আরো গল্প

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৮:১৭ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২০

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com